কাশ্মীরের উন্নয়নে ৩৭০ ধারা বাতিল জরুরি ছিল

শাহরিয়ার কবির। সাংবাদিক, কলামিস্ট, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা। একজন খ্যাতনামা শিশু সাহিত্যিক হিসেবেও পরিচিত তিনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করছেন দীর্ঘদিন ধরে। ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির নির্বাহী সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সাংবাদিকতা ও গবেষণার স্বার্থে কাশ্মীরে গেছেন বহুবার। লিখছেন, কাশ্মীরের সংগ্রাম-রাজনীতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে। সম্প্রতি কাশ্মীর, আসাম, রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজ- এর। দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি নিজস্ব মতামতও ব্যক্ত করেন।
ভারতের সংবিধান থেকে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের ঘটনা কীভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন?

শাহরিয়ার কবির : আমি এটিকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখছি না। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্বজুড়ে দক্ষিণপন্থার উত্থান ঘটেছে। সমাজতন্ত্রের পতনের পর আমরা আফগান জিহাদ লক্ষ্য করেছি। তালেবান, আল-কায়েদার মতো সংগঠন যুক্তরাষ্ট্র তৈরি করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটেছে ঠিক-ই, তবে এ সংগঠনগুলোর তো জায়গার দরকার ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি কাশ্মীরে তারা অবস্থান নেয় সে সময়ে।

১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরপরই কাশ্মীরে জঙ্গি মৌলবাদের বিস্তার ঘটে। ২০০০ সালে ‘কাশ্মীরের আকাশে মৌলবাদের কালোমেঘ’ নামে আমার একটি বই বের হয়। বইটিতে কাশ্মীরের সাতশ বছরের ইসলামের ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি তুলে ধরা হয়। আমি দেখেছি, ভারতের সবচেয়ে সেক্যুলার রাজ্য ছিল কাশ্মীর। কাশ্মীরিদের মতো অসাম্প্রদায়িক মানুষ এ উপমহাদেশে ছিল না।
১৯৪৭ সালের আগে ভারতজুড়ে সংঘাত হয়েছিল, শুধু কাশ্মীর বাদে। মহাত্মা গান্ধী সেই সময় বলেছিলেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের একমাত্র আশার আলো হচ্ছে কাশ্মীর।’ হিন্দুরা গরুকে দেবতা মানে বলে কাশ্মীরের মুসলমানরা গরুর মাংস খেত না। এরও ইতিহাস আছে। মুসলমান শাসকরাই গরুর মাংস খাওয়া বন্ধ করেছিল।

অনেকেই কাশ্মীরের ইতিহাস না জেনে কথা বলেন। পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই অনেকে মত দিচ্ছেন।
কাশ্মীরের সমাজে পরিবর্তনটা ঠিক কখন দেখা গেল?

শাহরিয়ার কবির : ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কাশ্মীর দখলের চেষ্টার মধ্য দিয়েই পরিবর্তনটা ঘটতে থাকল। কাশ্মীর স্বাধীন থাকার কথা ছিল। ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে পাকিস্তান প্রথম তাদের উপজাতিদের পাঠাল কাশ্মীর দখলের জন্য। তারা একটার পর একটা শহর দখল করতে থাকল। এরপর ওই বছরের ২১ অক্টোবর পাকিস্তান তাদের সৈন্যবাহিনী পাঠাল। কাশ্মীরের মহারাজার সৈন্যরা পাকিস্তানের সৈন্যদের মোকাবিলা করতে থাকল। কিন্তু ব্যর্থ হচ্ছিল। পরে মহারাজা ভারতের সাহায্য প্রত্যাশা করল। এ সময় ২৬ অক্টোবর এক বিশেষ চুক্তির মধ্য দিয়ে কাশ্মীর ভারতের অংশ হয়ে গেল।কাশ্মীর নিয়ে ভারত প্রথম জাতিসংঘে নালিশ করে। জাতিসংঘের প্রস্তাব ছিল, কাশ্মীর থেকে ভারত ও পাকিস্তানকে সরে আসতে হবে এবং গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরিরা সিদ্ধান্ত নেবে। এ নিয়ে পাকিস্তান-ভারত কোনো যুদ্ধে জড়াবে না।

পাকিস্তান সৈন্য সরাল না। ভারতও সরে এলো না। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধও হলো কাশ্মীর নিয়ে। ফলে আগের চুক্তি সব ভেস্তে গেল। কাশ্মীরের সংকট ঠিক তখন থেকেই তীব্র হলো।
৩৭০ ধারা বাতিল এ সংকটকে বাড়াল না-কি প্রশমিত করল?

শাহরিয়ার কবির : ৩৭০ ধারা থাকার কারণে কাশ্মীর উন্নয়নের ধারা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ভারতের অন্য রাজ্যগুলো থেকে তারা পিছিয়ে। কাশ্মীরে শিক্ষার উন্নয়ন হলো। কিন্তু শিল্পায়ন হলো না। এতে হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার তৈরি হতে থাকল। হাজার বছর ধরে হস্তশিল্পে তারা সুনাম কুড়িয়ে আসছে। কাশ্মীরি শাল, চাদর জগৎখ্যাত। কিন্তু ভারতের অন্য রাজ্যগুলোর সঙ্গে তাল মেলাতে পারছিল না। শিল্পায়ন করতে হলে বিনিয়োগ দরকার। কিন্তু বিনিয়োগের মতো অর্থ ছিল না তাদের।৩৭০ ধারা কাশ্মীরে ভারতের পুঁজি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল। শিল্পায়নের জন্য জমির দরকার। ভারতের শিল্পপতিরা কাশ্মীরে জমি কিনতে পারেনি। আমি কাশ্মীর ঘুরে এসে যে বই লিখেছিলাম, সেখানে ৩৭০ ধারা বাতিলের কথা বলেছি। কাশ্মীরের উন্নয়নের জন্যই ৩৭০ ধারা বাতিল জরুরি ছিল। কারণ বিশেষ মর্যাদার নামে তারা বছরের পর বছর ধরে বঞ্চিত হয়ে আসছিল।

Facebook Comments