নুসরাতকে হত্যার একদিন আগে মনি কিনে বোকরা, শামীম কেরোসিন

ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় আরো তিনজনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষ হয়েছে। গতকাল রবিবার তাঁরা সাক্ষ্য দেন। তাঁরা বলেছেন, নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার ঘটনার এক দিন আগে আসামি শাহাদাত হোসেন শামীম দুই লিটার কেরোসিন কেনে, যা সে পলিথিনে করে নিয়ে যায়। অন্যদিকে কামরুন নাহার মনি দুটি তৈরি বোরকা কিনেছিল।মামলার ৯২ জন সাক্ষীর মধ্যে এ পর্যন্ত আটজনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষ হয়েছে। আজ সোমবার নুসরাতের ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান এবং কাশ্মীরবাজার সড়কের দোকানি ও আসামি নুরউদ্দিনের প্রতিবেশী জহিরুল ইসলামের সাক্ষ্যগ্রহণ হবে।গতকাল যে তিনজনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষ হয়েছে তাঁরা হলেন ৬ নম্বর সাক্ষী বোরকা দোকানের মালিক জসিম উদ্দিন, ৭ নম্বর সাক্ষী একই দোকানের কর্মচারী হেলাল উদ্দিন ফরহাদ ও ৮ নম্বর সাক্ষী কেরোসিনের দোকান মালিক লোকমান হোসেন লিটন।আদালত সূত্রের বরাত দিয়ে জেলা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট হাফেজ আহাম্মদ জানান, গতকাল সকাল ১১টায় মামলার সব আসামিকে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মামুনুর রশিদের আদালতে আনা হয়।আদালত সূত্র জানায়, শুরুতে সাক্ষ্য দেন সোনাগাজীর চরচান্দিয়া এলাকার মুদি দোকানি লোকমান হোসেন লিটন। তিনি বলেন, ঘটনার আগের দিন অর্থাৎ ৫ এপ্রিল মামলার দুই নম্বর আসামি শাহাদাত হোসেন শামীম তাঁর দোকানে দুই লিটার কেরোসিন কিনতে আসে। কিন্তু তার সঙ্গে কোনো বোতল ছিল না। তিনি শামীমকে বোতল নিয়ে আসতে বলেন। বোতল ছাড়া কেরোসিন দেওয়া যাবে না সেটাও জানান। এ সময় শামীম তাঁকে ধমক দিয়ে পলিথিন ব্যাগে কেরোসিন দিতে বলে। তখন তিনি পলিথিন ব্যাগে দুই লিটার কেরোসিন দেন। প্রতি লিটার ৭০ টাকা করে ১৪০ টাকা দাম রাখেন তিনি।

অন্য সাক্ষী বোরকা দোকান মালিক জসিম উদ্দিন আদালতকে বলেন, সোনাগাজী মানিক মিয়া প্লাজায় তাঁর দোকান ‘ওয়ার্ল্ড ফেমাস বোরকা বাজার’। আসামি কামরুন নাহার মনি ও তার বান্ধবীরা গত ৩ মার্চ তাঁর দোকানে আসে এবং পাঁচটি বোরকা তৈরি করে দিতে বলে। এরপর ১৬ মার্চ সে দুটি বোরকা নিয়ে যায়। এক সপ্তাহ পরে আরো একটি নিয়ে যায়। নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার দুই দিন আগে অর্থাৎ ৪ এপ্রিল সে এসে আগে অর্ডার করা পাঁচটি বোরকার মধ্যে শেষের দুটি নিয়ে যায়। এ সময় মনি আরো দুটি বোরকা প্রয়োজন বলে জানায় এবং তখনই দেওয়ার জন্য অনুরোধ করে। তাকে বলা হয়, এত অল্প সময়ে দুটি বোরকা তৈরি করে দেওয়া সম্ভব নয়। তখন মনি দোকানে রাখা দুটি তৈরি বোরকা দেখিয়ে বলে—এই দুটি দিয়ে দিন। ১৯৮০ টাকার বিনিময়ে তাকে দুটি তৈরি বোরকা তাত্ক্ষণিকভাবে দেওয়া হয়।আরেক সাক্ষী বোরকা দোকানের কর্মচারী হেলাল উদ্দিন ফরহাদ বলেন, ঘটনার কয়েক দিন পর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কর্মকর্তারা মনিকে নিয়ে ওই দোকানে যান। এ সময় তিনি সেদিনের বোরকা ক্রেতা হিসেবে মনিকে শনাক্ত করেন।তদন্তকালে পিবিআই কেরোসিন বহন করা পলিথিন ব্যাগ ও হামলার সময় ব্যবহার করা বোরকা আলামত হিসেবে জব্দ করেছেন।

সাক্ষীদের জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী কামরুল হাসান, আহসান কবির বেঙ্গল ও নুরুল ইসলাম (৪)। তাঁরা বোরকা দোকানের মালিক জসিমকে প্রশ্ন করেন, জবানবন্দিতে তিনি যে বলেছেন মনি নেকাব পরা ছিল। তাহলে তিনি বোরকা সরবরাহের সময় অথবা তৈরি বোরকা বিক্রির সময় আসামিকে কিভাবে চিনতে পারলেন। জবাবে জসিম বলেন, মনি বোরকা ও নেকাব পরা ছিল। তাকে চিনতে পারার কথা নয়। কিন্তু সে নিজেই তার পরিচয় দিয়ে বলেছিল, ‘আমি মনি। বোরকার অর্ডার দিয়েছিলাম। এখন সেগুলো দিন।’ রশিদেও তার নামই ছিল। তা ছাড়া তার উপস্থিতিতে পরে ওই বোরকা পিবিআই উদ্ধার করেছে বলে তাঁরা কাগজে দেখেছেন বলে জসিম জানান।রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন পিপি হাফেজ আহাম্মদ, অ্যাডভোকেট আকরামুজ্জামান, এপিপি এ কে এস ফরিদউদ্দিন হাজারী ও অ্যাডভোকেট এম শাহজাহান সাজু।

Facebook Comments